সূরা আল ফুরকান (২৫:৭০) কিন্তু যারা তওবা করে বিশ্বাস স্থাপন করে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গোনাহকে পুন্য দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।

চলে গেলেন মাওলানা শাহাদাৎ হুসাইন খান।

চলে গেলেন মাওলানা শাহাদাৎ হুসাইন খান।
ড. আহমদ আবুল কালাম
শুক্রবার, ফেব্রুয়ারী ৮, ২০১৯, ১২:০৪:০৬ । ইসলাম ৪ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় দুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন মাওলানা শাহাদাৎ হুসাইন খান ফয়সাল। তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান তরুণ আলেম, ভীষণ সম্ভাবনাময় দ্বীনি গবেষক। তিনি ফুসফুসের সমস্যায় আক্রান্ত ছিলেন। চলে গেলেন মাওলানা শাহাদাৎ হুসাইন খান।



বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঝালকাঠি জেলার সঞ্জয়পুর গ্রামে নানাবাড়িতে ১৯৮৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা আবদুশ শহীদ খান আর মা আফরোজা খানম আরজু। বাবা ছিলেন স্কুলশিক্ষক আর মা গৃহিণী। তিন ভাই-বোনের মধ্যে মেজ ছিলেন শাহাদাৎ। ছোটবেলায় পারিবারিকভাবেই পড়াশোনায় হাতেখড়ি। তারপর মক্তবে কোরআন তেলাওয়াত ও আদব-কায়দা শেখা শুরু। পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুল পাঠ চুকিয়ে বরিশাল শহরে মুসলিম গোরস্তান রোড মাদ্রাসার হিফজখানায়। মাত্র ১২ বছর বয়সে ঢাকায় আসেন।
তিনি কওমি শিক্ষা ধারার সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদিস অর্জন করেন ঢাকার মাদ্রাসাতুল হাদিস থেকে, মুমতাজ শ্রেণিতে ২০০৮ সালে। আলিয়া শিক্ষাধারার সর্বোচ্চ স্তর কামিল ডিগ্রিও অর্জন করেন তিনি অসাধারণ কৃতিত্বের সঙ্গে। তিনি বিএ অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে, যথাক্রমে ২০১১ ও ২০১২ সালে। এখানেও তিনি তার বিরল কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। তিনি যথাক্রমে দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছেন।
শাহাদাৎ ছিলেন একজন তুখোড় গবেষক, গভীর জ্ঞান গবেষণার সাধক। বিরল ও কৌতূহলোদ্দীপক বিষয়ে তার জ্ঞান ছিল ব্যতিক্রমধর্মী। মাত্র কয়েক বছরে তিনি রিসার্চ জার্নালে ১০টি আর্টিকেল লিখেছেন। তার লিখিত ‘গুনাহ মাফের উপায়’ দেশব্যাপী যথেষ্ট আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারির বইমেলায় এর মোড়ক উন্মোচন করা হয়। প্রায় ১২ হাজারের মতো প্রশ্ন ও প্রশ্নের উত্তর সংবলিত ‘আলোকিত জ্ঞানী’ বইটি শাহাদাৎ হোসাইন সম্পাদনা করেছেন।
শাহাদাৎ ছিলেন জুমার মসজিদের একজন খতিব। কিন্তু তিনি গতানুগতিক ধারার নির্দিষ্ট কোনো মসজিদের খতিব ছিলেন না। তিনি খুতবা দিয়েছেন রাজধানীর অনেকগুলো মসজিদে। খুতবা দিয়েছেন রাজধানীর বাইরের অনেক মসজিদে। কিন্তু তা একবার বা দুইবারের বেশি নয়। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন মসজিদ কমিটি থেকে তাকে আমন্ত্রণ জানানো হতো জুমার নামাজ পরিচালনা করার জন্য, বিষয়ভিত্তিক খুতবা দেওয়ার জন্য। আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে তিনি নির্দিষ্ট বিষয়ে খুতবা দিতেন জুমার আজানের। দেখা গেছে, তিনি জুমার খুতবা দেওয়ার জন্য যেখানেই আমন্ত্রিত হতেন সেখানেই সকাল থেকে লোকে লোকারণ্য হয়ে যেত। প্রায়ই মসজিদ ভরে যেত তার বিষয়ভিত্তিক আলোচনা ও খুতবা শোনার জন্য।
শাহাদাৎ ছিলেন একজন ভালো লেখক। তিনি চমৎকার গদ্য লিখতেন ইসলামের নানা বিষয়ে। কোরআন ও সুন্নাহ সম্পর্কে যেহেতু তার অগাধ পা-িত্য ছিল সেহেতু এ-সম্পর্কিত যে বিষয়েই তিনি কলম ধরতেন সে বিষয়টি সম্পর্কে আকর্ষণীয় ধারণা দিতে সক্ষম হতেন তিনি। জাতীয় দৈনিকগুলোতে তার অনেক মৌলিক লেখা প্রকাশিত হয়েছে। আরবি ভাষায়ও তার স্বল্পসংখ্যক লেখা রয়েছে এবং তা মানুষের প্রশংসা অর্জন করেছে।
অল্পে তুষ্টি ছিল তার একটি বড় গুণ। তিনি সবসময় চাইতেন ন্যায় ইনসাফের ওপরে টিকে থাকতে। ইবাদত-বন্দেগির মধ্যে থাকতে। চরম কষ্ট ও আর্থিক অভাব-অনটনের মধ্যেও মানুষের কাছে তিনি আর্থিক সাহায্য চেয়েছেন, এমন কোনো দৃষ্টান্ত আমরা লক্ষ্য করিনি। অথচ তার বাবা-মা, ভাই-বোনসহ সম্পূর্ণ পরিবার বহন করার দায়িত্ব ছিল তারই ওপর। তার কষ্টের কথা সবসময়ই তিনি চেপে রাখতেন। তিনি নিকটজনের কাছেও শেয়ার করতেন না। মৃত্যুর পরে অনেকেই জেনেছেন, তার বিবাহযোগ্য বোনের বিয়ে হয়নি, তার একটি ভাই প্রতিবন্ধী, তার বাবা অবসর যাপন করছেন, ঢাকা শহরে মাথা গোঁজার মতো তার বা তার পরিবারের ঠাঁই নেই। গ্রামের বাড়িতেও যে তার পরিবার খুব সচ্ছল এমন নয়।
মৃত্যুচিন্তা সবসময় তাকে তাড়া করত। মৃত্যু সম্পর্কে তার অনেক বক্তব্য রয়েছে। এখানে ফেইসবুকে দেওয়া তার দুটি বক্তব্য তুলে ধরছি। তিনি ফেইসবুকে লিখেছেন ‘আমিহীন দুনিয়া’ শিরোনাম দিয়ে। তিনি লিখেছেন ‘মাঝে মাঝে নিজেকে কবরে (শায়িত) কল্পনা করে আমিহীন বাইরের দুনিয়াটা কল্পনা করি। দেখছি, সব ঠিকঠাক চলছে। আমার জন্য কিছুই থেমে নেই। অফিসের চেয়ারটাও খালি নেই। খালি নেই বাসার বিছানাটাও। আমিহীন দুনিয়ার সবই তো বেশ ভালোই আছে, ভালোই চলছে কিন্তু কেউ জানে না আমি কবরে কেমন আছি।’
দ্বীন-ইসলামের যেমন সহিহ আকিদা ও সহিহ আমল ছিল শাহাদাতের তেমন ছিল তার চমৎকার আমল-আখলাক। তিনি বিশ্বাস করতেন, সহিহ আকিদার সঙ্গে সহিহ আমল-আখলাক দরকার। যাদের সহিহ আকিদা ও সহিহ আমল রয়েছে তাদের যদি চমৎকার আচার-ব্যবহার না থাকে তাহলে সহিহ আকিদা ও সহিহ আমল প্রচার করা ও সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া খুবই কষ্টকর। এটি শাহাদাৎ বিশ্বাস করতেন বলেই তিনি সহিহ আকিদা সহিহ আমলের পাশাপাশি চমৎকার আচার-ব্যবহার করার চেষ্টা করতেন সবশ্রেণির মানুষের সঙ্গে।
তিনি ফেইসবুক ব্যবহার করতেন। ফেইসবুকে পোস্ট দিতেন, কমেন্ট করতেন। ফেইসবুকে তার অডিও-ভিডিও ও এগুলোর চিত্র উপস্থাপন করতেন। তার ফেইসবুক দেখলে যে কোনো সজ্জনের মনে হবে, এ সামাজিক গণমাধ্যমকে তিনি ব্যবহার করেছেন দ্বীনি দাওয়াতের প্রচারের মাধ্যম হিসেবে। তিনি আত্মপ্রচারের জন্য ফেইসবুক ব্যবহার করতেন না।
শাহাদাৎ অসাধারণ মেধাবী ছিলেন বলেই সারা বাংলাদেশে টেলিভিশন চ্যানেলের আলোকিত জ্ঞানীর চ্যাম্পিয়ন হতে সক্ষম হয়েছিলেন। অন্য একটি টেলিভিশন চ্যানেল হিটাচি জিনিয়াসেও তিনি ছিলেন চ্যাম্পিয়ন। জ্ঞানে অসাধারণ কৃতিত্বের স্বাক্ষর ছিল বলেই তিনি ১০ লক্ষাধিক টাকা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

লেখক : জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং মরহুমের শিক্ষক।



১৭ শ্রেণীর লোক মুসলমান হয়েও জান্নাতে যেতে পারবে না।
১.
 যে হারাম খাবার খায়:
যে দেহ হারাম খাদ্য দ্বারা লালিত-পালিত হয়েছে, তা জান্নাতে প্রবেশ করবে না। (বায়হাকি/৫৫২০)
২.
 আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী:
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। (বুখারি/৫৫২৫)
৩.
 প্রতিবেশীকে কষ্টদাতা:
যার অত্যাচার (আচরণ) থেকে প্রতিবেশীরা নিরাপদ নয়, তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন না।’ (মুসলিম/৬৬)
৪.
 অবাধ্য সন্তান ও দাইয়ুস:
তিন শ্রেণির লোক জান্নাতে যাবেন না—মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, দাইয়ুস (অর্থাৎ যে ব্যক্তি তার স্ত্রী-বোন প্রমুখ অধীনস্থ নারীকে বেপর্দা চলাফেরায় বাধা দেন না) এবং পুরুষের বেশ ধারণকারী নারী। (মুসতাদরাকে হাকেম/২২৬)
৫.
অশ্লীলভাষী ও উগ্র মেজাজি:
অশ্লীলভাষী ও উগ্র মেজাজি লোক জান্নাতে যাবেন না। (আবু দাউদ/৪১৬৮)
৬.
 প্রতারণাকারী শাসক:
মুসলমানদের ওপর প্রতিনিধিত্বকারী শাসক যদি এ অবস্থায় মারা যায় যে, সে তার অধীনস্তদের ধোকা দিয়েছে। তাহলে আল্লাহ তাআলা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন। (বুখারি/৬৬১৮)
৭.
 অন্যের সম্পদ আত্মসাৎকারীঃ
যে ব্যক্তি কসম করে কোনো মুসলমানের সম্পদ আত্মসাৎ করে, আল্লাহ তাআলা তার জন্য জাহান্নাম ওয়াজিব করে দেন এবং জান্নাত হারাম করেন। এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! যদি সামান্য কোনো জিনিস হয়? তিনি বললেন, পিপুল গাছের একটি ছোট ডাল হলেও। (মুসলিম/১৯৬)
৮.
 খোঁটাদাতা, অবাধ্য সন্তান ও মদ্যপী:
উপকার করে খোঁটা দানকারী, মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান, সর্বদা মদপানকারী—এই তিন শ্রেণির মানুষ জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। (নাসায়ি/ ৫৫৭৭)
৯.
চোগলখোরঃ
যারা মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশে কুৎসা রটায় (চোগলখোর) তারা জান্নাতে প্রবেশ করবেন না। (মুসলিম/১৫১)
১০.
 অন্যকে নিজের পিতা পরিচয়দাতা:
যে ব্যক্তি জেনে শুনে নিজেকে অন্য পিতার সঙ্গে সম্পর্কিত করে—অর্থাৎ নিজেকে অন্য পিতার সন্তান বলে পরিচয় দেয়, তার জন্য জান্নাত হারাম।’ (বুখারি/ ৬২৬৯)
১১.
দাম্ভিক ও অহংকারকারী:
যার অন্তরে অণু পরিমাণ অহংকার রয়েছে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেন না।’ (মুসলিম/ ১৩১)
১২.
 আল্লাহর রাসুল (স)-এর অবাধ্য:
আমার সব উম্মত জান্নাতে যাবেন, কিন্তু যিনি (জান্নাতে যেতে) অস্বীকার করেছেন, তিনি নন। সাহাবিরা বললেন, আল্লাহর রাসুল! কে অস্বীকার করেছেন? তিনি বললেন, যিনি আমার আনুগত্য করেন, তিনি জান্নাতে যাবেন। আর যিনি আমার নাফরমানি করেন, তিনি (জান্নাতে যেতে) অস্বীকার করেছেন।’ (বুখারি/৬৭৩৭)
১৩.
দুনিয়াবি উদ্দেশে ইলম শিক্ষাকারী:
যে ইলম দ্বারা আল্লাহর সন্তুষ্টি অন্বেষণ করা হয়, সেই ইলম যদি কোনো ব্যক্তি দুনিয়াবি স্বার্থ-সম্পদ হাসিলের উদ্দেশে শিক্ষা করেন, তিনি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবেন না।’ (আবু দাউদ/৩১৭৯)

১৪.
 যে নারী অকারণে তালাক চান:
যে নারী তার স্বামীর কাছে অকারণে তালাক কামনা করেন, তিনি জান্নাতের ঘ্রাণও পাবেন না।’ (তিরমিজি/ ১১০৮)
১৫.
কালো কলপ ব্যবহারকারী:
শেষ যুগে কিছু লোক কবুতরের সিনার মতো কালো কলপ ব্যবহার করবেন। তারা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবেন না।’ (নাসায়ি/৪৯৮৮)
১৬.
 লৌকিকতা প্রদর্শনকারী:
কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম একজন শহীদকে ডাকা হবে। অতঃপর একজন কারিকে। তারপর একজন দানশীল ব্যক্তিকে হাজির করা হবে। প্রত্যেককে তার কৃতকর্ম সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। অতঃপর শহীদকে বীর-বাহাদুর উপাধি লাভের উদ্দেশে জিহাদ করার অপরাধে, কারি সাহেবকে বড় কারির উপাধি ও সুখ্যাতি লাভের জন্য কেরাত শেখার অপরাধে এবং দানশীলকে বড় দাতা উপাধি লাভের উদ্দেশে দান-সদকা করার অপরাধে উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।’ (মুসলিম/৩৫২৭)
১৭.
 ওয়ারিসকে বঞ্চিতকারী:
যে ব্যক্তি কোনো ওয়ারিসকে তার অংশ (প্রাপ্য) থেকে বঞ্চিত করল, আল্লাহ তাআলা তাকে জান্নাতের অংশ থেকে বঞ্চিত করবেন। (ইবনে মাজাহ /২৬৯৪)

আল্লাহ আমাদের এসকল কাজ থেকে হেফাজত করুন

No comments:

Post a Comment