এক. আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা :
আল্লাহ তা'আলার তাওহীদের সাথে অন্য কোনো কিছু কে অংশীদার সাব্যস্ত করাই শিরক।
তাওহীদ শব্দের আভিধানিক অর্থ- এক করা, একক ও অদ্বিতীয় সাব্যস্ত করা, একত্ব প্রতিষ্ঠা করা। শারী‘য়াতের পরিভাষায় তাওহীদের অর্থ হলো- আল্লাহ্কে তাঁর সুমহান জাত (সত্তা) সর্বসুন্দর নাম ও সিফাতে (গুণরাজি-বৈশিষ্ট্যে) এবং তাঁর অধিকার, কর্ম ও কর্তৃত্বে এক, একক ও অদ্বিতীয় ষোষণা ও সাব্যস্ত করা, এবং এসব ক্ষেত্রে নিজের কথা, কাজ ও বিশ্বাসের দ্বারা আল্লাহ্র একত্ব অক্ষুন্ন রাখা।
তাওহীদ তিন প্রকার যথা:-
(১) তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ। আর তা হলো- নিজের কথা, কাজ ও বিশ্বাসের দ্বারা আল্লাহ্কে তাঁর যাবতীয় কর্ম ও কর্তৃত্বে এক ও অদ্বিতীয় তথা লা-শরীক (অংশীদারহীন) সাব্যস্ত করা।
(২) তাওহীদুল উলূহিয়্যাহ। অর্থাৎ- ‘ইবাদাতে আল্লাহ্র একত্ব অক্ষুন্ন রাখা। অন্য কথায়, ‘ইবাদাতে আল্লাহ্র একত্ব প্রতিষ্ঠা করা।
(৩) তাওহীদুল আছমা ওয়াস্সিফাত।
অর্থাৎ- আল্লাহ্কে তাঁর নাম ও গুণাবলীতে এক ও অদ্বিতীয় সাব্যস্ত করা। অন্য কথায়, আল্লাহ্র সুমহান নাম ও গুণাবলীতে আল্লাহ্র একত্ব অক্ষুন্ন রাখা। যেমন, আল্লাহ তা'আলা রিজিক দাতা, বিধান দাতা, সার্বভৌমত্বের মালিক, সকল ক্ষমতার মালিক ইত্যাদি।
“সাব্যস্ত করার’’ অর্থ হলো- নিজের ‘আক্বীদাহ-বিশ্বাসে, কথা-বার্তায় ও কাজে-কর্মে আল্লাহ্র একত্ববাদ প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত করা।
তাওহীদের কোনো একটি প্রকারে অন্য কোনো কিছু কে অংশীদার সাব্যস্ত করা মানে শিরক করা। যে বা যারা শিরক করবে তারা মুশরিক হয়ে যাবে। মুশরিকদের বিষয়ে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
‘নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে অংশীদার করা ক্ষমা করেন না। তা ব্যতীত অন্যান্য অপরাধ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন; এবং যে কেউ আল্লাহর সঙ্গে শিরক করে সে এক মহাপাপ করে।’ [সুরা নিসা ৪ : ৪৮]
‘কেউ আল্লাহর সঙ্গে শিরক করলে অবশ্যই আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করবেন এবং তার আবাস জাহান্নাম। আর জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।’ [সুরা মায়িদা, ৫ : ৭২]
দুই. আল্লাহ এবং বান্দার মধ্যে কাউকে মধ্যস্থতাকারী বানানো :
‘তারা আল্লাহকে ব্যতীত যার ইবাদাত করে তা তাদের ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। তারা বলে, এরা আল্লাহর নিকট আমাদের সুপারিশকারী। বল, তোমরা কি আল্লাহকে আকাশমণ্ডলি ও পৃথিবীর এমন কিছুর সংবাদ দিচ্ছ, যা তিনি জানেন না? তিনি মহান, পবিত্র এবং তারা যাকে শরিক করে তা হতে তিনি ঊর্ধ্বে।’ [সুরা ইউনুস, ১০ : ১৮]
‘জেনে রাখ, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য। যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্যকে অভিভাবকরুপে গ্রহণ করে তারা বলে, ‘আমরা তো এদের পূজা এজন্যই করি যে, ইহারা আমাদের আল্লাহর সান্নিধ্যে নিয়ে যাবে।’ তারা যে বিষয়ে নিজেদের মধ্যে মতভেদ করছে আল্লাহ তার ফয়সালা করে দিবেন। যে মিথ্যাবাদী ও কাফির আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।’ [সুরা যুমার, ৩৯ : ৩]
তিন. মুশরিক-কাফিরদের কাফির মনে না করা :
এমন কাফির, যার কুফরির ব্যাপারে আহলুস সুন্নাহ একমত। সেটা আসলি কাফির হতে পারে—যেমন ইহুদি, খৃস্টান ও হিন্দু সম্প্রদায়—আবার মুরতাদ, যিনদিকও হতে পারে, যেমন প্রকাশ্যে আল্লাহ, রাসুল বা দীনের কোনো অকাট্য ব্যাপার নিয়ে কটূক্তিকারী; যাদের কুফরির ব্যাপারে হকপন্থি আলিমগণ একমত।
চার. নবি (সা.)’র ফয়সালার তুলনায় অন্য কারও ফয়সালাকে উত্তম মনে করা :
‘আপনি কি তাদের দেখেননি, যারা দাবি করে যে, যা আপনার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে এবং আপনার পূর্বে যা অবর্তীণ হয়েছে, আমরা তার ওপর ঈমান এনেছি। তারা বিচার-ফয়সালা নিয়ে যেতে চায় তাগুতের কাছে, অথচ তাদের প্রতি নির্দেশ হয়েছে, যাতে তারা তাকে মান্য না করে। পক্ষান্তরে শয়তান তাদের প্রতারিত করে পথভ্রষ্ট করে ফেলতে চায়।’ [সুরা নিসা, ৪ : ৬০]
পাঁচ. মুহাম্মাদ (সা.) আনীত কোনো বিধানকে অপছন্দ করা :
‘অতএব, তোমার পালনকর্তার কসম, সে লোক ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক বলে মনে না করে। এরপর তোমার মীমাংসার ব্যাপারে নিজের মনে কোনো রকম সংকীর্ণতা পাবে না এবং তা সন্তুষ্টচিত্তে কবুল করে নেবে।’ [সুরা নিসা, ৪ : ৬৫]
ছয়. দীনের কোনো বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা :
“তুমি তাদের প্রশ্ন করলে তারা নিশ্চয়ই বলবে, ‘আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করছিলাম।’ বলো, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত ও তাঁর রাসুলকে বিদ্রুপ করছিলে?’ তোমরা অযুহাত দেয়ার চেষ্টা করো না। তোমরা তো ঈমান আনার পর কুফরি করেছ।” [সুরা তাওবা, ৯ : ৬৫-৬৬]
সাত. জাদু করা :
‘সুলাইমান কুফরি করেনি, কুফরি তো করেছিল শয়তানরাই। তারা মানুষকে জাদু শিক্ষা দিত…।’ [সুরা বাকারা, ২ : ১০২]
আট. মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের সমর্থন ও সহযোগিতা করা :
‘হে মুমিনগণ! তোমাদের পিতা ও ভাইও যদি ঈমানের বিপরীতে কুফরিকে বেছে নেয়, তবে তাদের অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করো না। তোমাদের মধ্যে যারা তাদের অন্তরঙ্গরূপে গ্রহণ করে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।’ [সুরা তাওবা, ৯ : ২৩]
‘হে মুমিনগণ! তোমরা ইহুদি ও খৃস্টানদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করো না। তারা পরস্পরের বন্ধু। তোমাদের মধ্যে কেউ তাদের বন্ধুরূপে গ্রহণ করলে সে তাদেরই একজন বলে গণ্য হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পাপাচারী সম্প্রদায়কে সৎপথে পরিচালিত করেন না।’ [সুরা মায়িদা, ৫ : ৫১]
নয়. কাউকে দীন-শরিয়তের ঊর্ধ্বে মনে করা :
‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণাঙ্গ করলাম ও তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন হিসেবে মনোনীত করলাম।’ [সুরা মায়িদা, ৫ : ৩]
দশ: দীন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়া :
‘যে ব্যক্তি তার প্রতিপালকের নিদর্শনাবলি দ্বারা উপদিষ্ট হয়েও তা হতে মুখ ফিরিয়ে নেয় তার অপেক্ষা অধিক অপরাধী আর কে? আমি অবশ্যই অপরাধীদের শাস্তি দিয়ে থাকি।’ [সুরা সাজদা, ৩২ : ২২]
ব্যক্তি তার নিজের নফস, বিবেক-বুদ্ধি, প্রবৃত্তি, যুক্তি, পীর, সূফী, দল, সংগঠন, ধর্মীয় নেতা, রাজনৈতিক নেতা/নেত্রী, বাপ-দাদা, পূর্বপুরুষদের দোহাই দিয়ে কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবিদের আকীদাহ ও মানহাযের বিপরীত ইসলাম বিরোধী আকীদাহ, শির্ক, কুফরি ইত্যাদিকে গ্রহণ করলে। তার ঈমান ভেঙে যাবে।
উপরে বর্ণিত ঈমান ভঙ্গের কারণ গুলো কোন ব্যক্তির মাঝে পাওয়া গেলে তার ঈমান ভেঙে যাবে। তাকে তাওবা করে আবার ইসলামে ফিরে আসতে হবে। তানা হলে সেই ব্যক্তি মুশরিক বা মুরতাদ অবস্থায় মৃত্যু বরণ করবে। সকল মুসলমানদের উচিত সকল প্রকার ঈমান ভঙ্গকারী বিষয় থেকে নিজেদের মুক্ত রাখা। আল্লাহ তা'আলা আমাদের সকলকে ঈমান ভঙ্গকারী বিষয় গুলো থেকে মুক্ত হওয়ার তাওফিক দিন। আমীন
মুহাম্মাদ হামিদুল ইসলাম আজাদ
Mohammad Hamidul Islam Azad - মুহাম্মাদ হামিদুল ইসলাম আজাদ
